You are currently viewing আর্থ্রোফাইব্রোসিস বা জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া
অপারেশনের রোগীদের জয়েন্ট শক্ত হয়ে আর্থ্রোফাইব্রোসিস হয় । এই কন্ডিশনে ইনজুরি বা সার্জারির পর অথবা কোনো কারণ ছাড়াই আপনার জয়েন্ট শক্ত হয়ে যায়।

আর্থ্রোফাইব্রোসিস বা জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া

অপারেশনের পর দীর্ঘদিন জয়েন্টের স্বাভাবিক নড়াচড়া না হওয়ার কারণে রোগীদের জয়েন্ট শক্ত হয়ে যায়। এই ধরণের কন্ডিশনের নাম আর্থ্রোফাইব্রোসিস। আর্থ্রোফাইব্রোসিস হলো ইনজুরি বা সার্জারির পর অথবা কোনো কারণ ছাড়াই আপনার জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া।

আমি ডা. মো: গোলজার আহমেদ,আজ অপারেশনের পর জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া এবং এর থেকে সৃষ্ট ব্যথা থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি। আসুন লেখাটি শেষ পর্যন্ত ধৈর্য সহকারে পড়ি।

  • আর্থ্রোফাইব্রোসিস কী
  • স্কার টিস্যু কী
  • আর্থ্রোফাইব্রোসিস কোথায় হয়
  • আর্থ্রোফাইব্রোসিসের লক্ষণ ও উপসর্গ
  • আর্থ্রোফাইব্রোসিসের কারণ
  • আর্থ্রোফাইব্রোসিস নির্ণয়
  • আর্থ্রোফাইব্রোসিসের চিকিৎসা

আর্থ্রোফাইব্রোসিস কী

আর্থ্রোফাইব্রোসিস এমন একটি কন্ডিশন যা সার্জারি বা ইনজুরির পর চিকিৎসার অংশ হিসাবে অনড় জয়েন্টের ভিতরে বা চারপাশে শক্ত (স্কার) টিস্যু তৈরি করে।জয়েন্টের ভিতরে অতিরিক্ত কোলাজেন তৈরি হয়ে আঠালো রূপ ধারণ করে। এই কোলাজেন ঘন হতে হতে একসময় স্কার টিস্যু তৈরি হয়।ফলে জয়েন্ট নাড়াচাড়া করতে গেলেই তীব্র ব্যথার অনুভূতি হয়।

স্কার টিস্যু কী

স্কার টিস্যু ঘন ও আঠালো একটি ফাইব্রাস টিস্যু। যখন অতিরিক্ত তৈরি হয় তখন জয়েন্টকে শক্ত ও অনড় করে তোলে। ফলে জয়েন্টের স্বাভাবিক রেঞ্জ অব মোশন নষ্ট হয় এবং ব্যথা তৈরি করে। এর ফলে জয়েন্ট সংশ্লিষ্ট মাংসপেশি ও যোজক কলাগুলোকে খাটো ও শক্ত করে ফেলে যা কনট্রাকচার নামে বহুল পরিচিত।

আর্থ্রোফাইব্রোসিস কোথায় হয়

হাঁটু, কোমর, গোড়ালি, পায়ের পাতা,কাঁধ (ফ্রোজেন শোল্ডার), কনুই (টেনিস এলবো),কব্জি, হাতের জয়েন্ট থেকে শুরু করে মেরুদণ্ডের হাড়ের জয়েন্টেও আর্থ্রোফাইব্রোসিস হতে দেখা যায়। ইনজুরি বা সার্জারির পর অথবা কোনো কারণ ছাড়াই আপনার জয়েন্ট শক্ত হয়ে যেতে পারে।

আর্থ্রোফাইব্রোসিসের লক্ষণ ও উপসর্গ

১. জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া
২. জয়েন্টে তীব্র ও অনবরত ব্যথা
৩. জয়েন্টের রেঞ্জ অব মোশন হ্রাস
৪. জয়েন্ট ফুলে ওঠা
৫. মটমট শব্দ হওয়া (crepitus)

উল্লেখ্য অনেক সময় জয়েন্ট, ইনজুরি বা অপারেশনের ধরণ ভেদে উপসর্গ পরিবর্তিত হতে পারে। এসব উপসর্গের কারণে হাঁটা-চলা, চেয়ারে ওঠা- বসা,দৈনন্দিন কাজ-কর্ম ইত্যাদি জরুরি কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

আর্থ্রোফাইব্রোসিসের কারণ

বেশ কিছু অপারেশন যেমন অ্যান্টেরিয়র ক্রশিয়েট লিগামেন্ট (এসিএল) রিকনস্ট্রাকশন সার্জারি (anterior cruciate ligament (ACL) reconstruction surgery) বা টোটাল নি আর্থোপ্লাস্টির (total knee arthroplasty (TKA))কারণে সৃষ্ট আর্থ্রোফাইব্রোসিস খুব সাধারণ একটি কন্ডিশন।

আমাদের দেহ স্বাভাবিকভাবেই আঘাত, ইনজুরি বা অপারেশনের পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ কোলাজেন তৈরি করে। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যদি আক্রান্ত স্থানে ইনফেকশন থাকে তাহলে শরীর প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কোলাজেন তৈরি করে ফেলে। ফলে তা ধীরে ধীরে ঘন হতে শুরু করে। এই ঘন আঠালো তরলই এক সময় স্কার টিস্যুতে রূপ নয়ে।

০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই অতিরিক্ত কোলাজেন তখনই তৈরি হয় যখন আক্রান্ত স্থান সুস্থ হওয়ার পরও শরীর সেই তথ্য জানতে পারে না।

আর্থ্রোফাইব্রোসিস নির্ণয়

উপরোল্লিখিত লক্ষণ ও উপসর্গগুলো নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি কিছু প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা করবেন। পাশাপাশি আপনার ইনজুরি বা সার্জারির সম্পর্কে জানতে চাইবেন। এরপর চিকিৎসক জয়েন্টের রেঞ্জ অব মোশন পরিমাপ করবেন। এসব পরীক্ষার মাধ্যমেই সাধারণত রোগ নির্ণয় হয়ে যায়। তবুও যদি চিকিৎসক মনে করেন তাহলে এক্সরে বা এমআরআই (magnetic resonance imaging) করাতে পাঠাতে পারেন।

আর্থ্রোফাইব্রোসিসের চিকিৎসা

এই কন্ডিশনটি চিকিৎসার জন্য প্রথমেই আপনাকে একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। ব্যথা ও ফোলা কমানোর জন্য আর্থ্রোফাইব্রোসিসের প্রথম চিকিৎসা শুরু হয় বিশ্রাম, ঠাণ্ডা বা বরফের সেঁক,এবং প্রদাহবিরোধী ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে।অনেক সময় জড়তা কাটিয়ে রেঞ্জ অব মোশন বাড়ানোর জন্য আইসোমেট্রিক এক্সারসাইজ, স্ট্রেন্দেনিং এক্সারসাইজ করাতে পারেন আপনার ফিজিওথেরাপিস্ট।ডিটিএফ (ডিপ ট্রান্সভার্স ফ্রিকশন), জিটিএফ (জেন্টেল ট্রান্সভার্স ফ্রিকশন) এর মত কিছু মেন্যুপুলেশন থেরাপিও প্রদান করে থাকেন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকগণ। এছাড়াও TENS (ট্রান্সকিউটেনিয়াস ইলেকট্রিকাল নার্ভ স্টিমুলেশন) ও EMS (ইলেক্ট্রিক্যাল মাসল স্টিমুলেটর) প্রভৃতি ইলেক্ট্রোথেরাপি মডিউল ব্যবহার করেন ফিজিওথেরাপিস্টগণ। এসব থেরাপিতে স্কার টিস্যুগুলো ভেঙে যায় এবং জয়েন্ট স্বাভাবিক হয়ে আসে। তবে কারও কারও অবস্থা এমন বাজে রূপ ধারণ করে যে তার সার্জারির মাধ্যমে স্কার টিস্যু সরাতে হয়। এমতাবস্থায় আপনার ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক অর্থোপেডিক সার্জনের কাছে রেফার করবেন।উল্লেখ্য যে, সার্জারির মাধ্যমে স্কার টিস্যু অপসারণের পর আবারও আপনাকে ফিজিওথেরাপি নিতে হবে।নইলে আবার স্কার টিস্যু হয়ে আগের মত দুরবস্থায় পড়তে পারেন।

সার্জারির প্রয়োজন না হলে কয়েক সপ্তাহের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার মাধ্যমে আর্থ্রোফাইব্রোসিসের হাত থেকে মুক্তি দিতে পারেন একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হচ্ছে যে,যেকোনো ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নেওয়ার আগে জেনে নিন যিনি চিকিৎসা করবেন তিনি বিপিটি ডিগ্রীর সনদপ্রাপ্ত ফিজিওথেরাপিস্ট কিনা। কারণ অনেক ভুয়া ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীদের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এবং চিকিৎসার নামে রোগীকে আরও অসুস্থ করে দিচ্ছে।

প্রিয় পাঠক,অপারেশন পরবর্তী জয়েন্ট শক্ত হওয়া নিয়ে যদি কোনো প্রশ্ন থাকে তাহলে কল করুন আমার হেল্প লাইনে অথবা মেসেজ ইনবক্সে। ধন্যবাদ ধৈর্য্য নিয়ে পুরো লেখাটি পড়ার জন্য। আপনার সার্বিক মঙ্গল ও সুস্থতা কামনা করছি।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

article-footer

Leave a Reply