অনেক শিশুর জন্মের আগেই গোড়ালির অস্থিসন্ধির হাড়ের অবস্থানগত তারতম্যের জন্য পায়ের পাতা ভেতরের দিকে ভাঁজ হয়ে থাকে, যা গলফ খেলার স্টিক বা ক্লাবের মতো দেখায়। এই কারণে একে ক্লাবফুট বলা হয়। বাংলায় যাকে ‘মুগুর পা’ বা ‘চক্রপদ’ বলা হয়। তবে মেডিকেলের ভাষায় এর নাম ‘কনজেনিটাল টেলিপেস ইকুইনো ভেরাস (সিটিইভি)’।
প্রতিবছর বাংলাদেশে ৫ হাজারেরও বেশি শিশু ক্লাবফুট নিয়ে জন্মায়। তবে সুখবর হচ্ছে এর চিকিৎসা রয়েছে। আমি ডা. মো: গোলজার আহমেদ, ক্লাবফুট বিশেষজ্ঞ হিসাবে এই লেখায় এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে যাচ্ছি। আসুন লেখাটি শেষ পর্যন্ত ধৈর্য সহকারে পড়ি।
- ক্লাবফুটের কারণ
- ক্লাবফুটের ধরণ
- ক্লাবফুট নির্ণয়
- ক্লাবফুট চেনার উপায়
- ক্লাবফুট এর জটিলতা
- ক্লাবফুট এর চিকিৎসা
- ক্লাবফুট প্রতিরোধে করণীয়
ক্লাবফুটের কারণ
চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই আধুনিক যুগেও অনেক পরিবার কুসংস্কারাচ্ছন্ন। অশরীরীর বদ বাতাস লাগা, চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণের সময় গর্ভবতীর বাইরে যাওয়া ইত্যাদিকে কারণ হিসাবে ধরে নেয়। এ জন্য তারা মাকে দোষারোপ করেন এবং নিয়তি হিসাবে মেনে নেন। অথচ এর সাথে এসবের কোনো সম্পর্কই নেই। আর রোগটি হওয়ার পেছনে মা বাবার সরাসরি কোনো ভূমিকাও নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর শরীরে কোষের মৌলিক গঠনের কিছু পরিবর্তনের কারণে এই সমস্যা তৈরি হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এটি বংশগত বিষয়। এছাড়া গর্ভাবস্থায় ভাইরাসের সংক্রমণ, আয়রন ও ফলিক এসিডের ঘাটতি এবং অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণকে ক্লাবফুটের জন্য দায়ী করা হয়। অনেক সময় অন্যান্য রোগ যেমন আর্থ্রোগ্রাইপোসিস মাল্টিপ্লেক্স কনজেনিটাল, জন্মগত হিপ জয়েন্ট ত্রুটি (DDH) অথবা চারকোট ম্যারি টুথ ডিজিজ নামক কঠিন রোগের সাথে ক্লাবফুট হয়ে থাকে।
ক্লাবফুটের ধরণ
ক্লাবফুটের সাথে অন্য কোনো রোগ বা স্বাস্থ্য সমস্যা থাকা বা না থাকা এবং অবস্থার উপর ভিত্তিতে একে ৩ ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলো হচ্ছে:
ইডিওপ্যাথিক ক্লাবফুট: যদি বাচ্চার পায়ে শুধু ক্লাবফুটই থাকে, অর্থাৎ সাথে অন্য কোনো অসুস্থতা না থাকে তাকে ইডিওপ্যাথিক ক্লাবফুট বলা হয়। এই ধরণের ক্লাবফুটের চিকিৎসা জটিল নয়। সাধারণত প্লাস্টার করে এর চিকিৎসা করা হয়।
সিন্ড্রোমিক ক্লাবফুট: ক্লাবফুটের সাথে অন্যান্য শারীরিক জটিলতা থাকলে তাকে সিন্ড্রোমিক ক্লাবফুট বলা হয়। এধরণের ক্লাবফুটের চিকিৎসায় অপারেশনেরও প্রয়োজন পড়ে।
পশ্চারাল ক্লাবফুট: কিছু বাচ্চার পা ক্লাবফুটের মত বাঁকা বলে মনে হয়। তবে এর জন্য জটিল কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে না। এই ধরণের ক্লাবফুটকে পশ্চারাল ক্লাবফুট বলে।
ক্লাবফুট নির্ণয়
সাধারণত গর্ভাবস্থার ২২ থেকে ২৪ সপ্তাহের মধ্যে আল্ট্রাসনোগ্রাফি, অ্যানোমালি স্ক্যান করতে গিয়ে শিশুর ক্লাবফুট ধরা পড়ে। তবে নিশ্চিতভাবে নির্ণয়ের জন্য প্রসব পরবর্তী সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়। জন্মের পর চারটি লক্ষণ খালি চোখে দেখে বোঝা যায় শিশুটি এতে আক্রান্ত কিনা। সংক্ষেপে এই লক্ষণ ৪টিকে CAVE বলে। C = Cavus, A = Adductus, V = Varus, E = Equinus. এছাড়াও পায়ের এক্সেরে করে চিকিৎসক ক্লাবফুটের অবস্থা নির্ণয় করেন।
ক্লাবফুট চেনার উপায়
১. শিশু মায়ের গর্ভ থেকে এই ত্রুটি নিয়ে জন্মায়।
২. পায়ের পাতা গোড়ালি থেকে ভিতরের দিকে বেঁকে থাকে।
৩. যেকোনো এক বা দুই পা’ই বাঁকা থাকতে পারে।
৪. বাড়ন্ত বয়সে শিশু বাঁকা পায়ের উপর দাঁড়াতে বা খুঁড়িয়ে হাঁটে।
ক্লাবফুট এর জটিলতা
১. ঠিকমত হাঁটতে বা দৌড়াতে পারে না।
২. খেলাধুলা করতে অসুবিধার সম্মুখীন হয়।
৩. শিক্ষাগত ও পেশাগত জীবনে এরা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়।
৪. সামাজিকভাবে কটুকথা/উত্যক্ততার সম্মুখীন হয়ে হেয় প্রতিপন্ন হয়।
৫. এরা অন্যদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং সমাজ ও পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
৬. সামাজিকভাবে এরা নিজেদের অভিশপ্ত মনে করে হতাশায় জর্জরিত হয় এবং পরবর্তীতে ভিক্ষাবৃত্তিকে জীবিকা হিসাবে বেছে নিতে বাধ্য হয়।
ক্লাবফুট এর চিকিৎসা
বিশ্বনন্দিত আধুনিক পনসেটি পদ্ধতির মাধ্যমে শিশুর জন্মের ৭-১০ দিনের মধ্যে ক্লাবফুটের চিকিৎসা শুরু করা হয়। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায় চিকিৎসার ফলাফল ততো ভালো হবে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, জন্মের পরপরই একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে পনসেটি চিকিৎসা নেওয়া শিশুদের ৯৮ ভাগেরই পা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। পনসেটি পদ্ধতিতে কোনো বড় অপারেশন ছাড়াই শুধু পর্যায়ক্রমিক প্লাস্টার করে ধীরে ধীরে বাঁকা পা সোজা করে আনা হয়। তবে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা পদ্ধতি। শিশুকে ৫ বছর পর্যন্ত এই চিকিৎসার আওতায় থাকতে হয়। তাই এই চিকিৎসার সফলতার জন্য শিশুর বাবা-মা সহ পরিবারের সকলের বোঝাপড়া ও সহযোগিতা খুবই জরুরি। পনসেটি চিকিৎসার ৩টি ধাপ রয়েছে। ধাপগুলো হচ্ছে:
১. পর্যায়ক্রমিক প্লাস্টার
২. গোড়ালির অপারেশন (টেনোটমী)
৩. নিয়মিত ব্রেস ও জুতো পরানো।
পনসেটি চিকিৎসা পদ্ধতি একটি দীর্ঘ আলোচ্য বিষয়। এ নিয়ে পরে একটি লেখা লেখার আশা প্রকাশ করছি।
ক্লাবফুট প্রতিরোধে করণীয়
১. ধূমপান, তামাকজাত পণ্য ও মদ্য পান থেকে বিরত থাকা।
২. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো প্রকার ওষুধ সেবন না করা।
৩. চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভাবস্থায় মায়ের এম এম আর ভ্যাকসিন নেওয়া।
৪. চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট খাওয়া
৫. পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টিকর, ভিটামিনযুক্ত ফল ও শাক-সবজি গ্রহণ করা।
প্রিয় পাঠক, ক্লাবফুটের চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন। তাই এ নিয়ে যদি কোনো প্রশ্ন থাকে তাহলে কল করুন আমার হেল্প লাইনে অথবা মেসেজ ইনবক্সে। ধন্যবাদ শেষ পর্যন্ত লেখাটি পড়ার জন্য। আপনার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
