প্যারালাইসিসের সাথে আপনি নিশ্চয়ই পূর্ব পরিচিত। অচল হয়ে বিছানায় পড়ে থাকা এমন রোগী হয়তো আপনার নিকটজন অথবা পরিচিতদের মধ্যে দেখেছেন। প্যারালাইসিস মূলত কোনো রোগ নয়। স্ট্রোকের ফলে কর্মক্ষম মাংসপেশির উপর মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর আংশিক বা সম্পূর্ণ শারীরিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় তাকে প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাত বলে। প্যারালাইসিসে শরীর শুধু অচলই হয় না, আক্রান্ত স্থানের অনুভূতিও নষ্ট হয়ে যায়।
এই লেখাটি পড়ে হয়তো আপনি কোনো প্যারালাইজড রোগীকে সুস্থ কারার জন্য করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইছেন। আমি ডা. মো: গোলজার আহমেদ আপনার উদ্বিগ্নতা বুঝতে পেরেই এই লেখার অবতারণা করেছি। প্যারালাইজড রোগীকে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা যায় কিনা তা আমরা লেখার শেষ পর্যন্ত পড়ে জানবো।
- প্যারালাইসিস কেন হয়
- প্যারালাইসিস এর উপসর্গ
- প্যারালাইসিসের প্রকারভেদ
- প্যারালাইসিস থেকে সৃষ্ট জটিলতা
- প্যারালাইসিসের চিকিৎসা
- প্যারালাইসিসে ফিজিওথেরাপি
প্যারালাইসিস কেন হয়
বিভিন্ন কারণে প্যারালাইসিস হতে পারে। প্যারালাইসিসের স্থায়িত্বকাল এসব কারণভেদে একেক রকম হয়ে থাকে। প্যারালাইসিসের সবচেয়ে পরিচিত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে স্ট্রোক। এছাড়াও স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি অথবা ঘাড়ে আঘাত থেকেও মানুষ প্যারালাইজড হয়। অ্যামায়োট্রফিক ল্যাটেরাল স্ক্লেরোসিস, গুলেন-বারি সিনড্রোমের মত অটোইমিউন ডিজিজের মত রোগ হলেও প্যারালাইজড হতে পারেন রোগী।
প্যারালাইসিস এর উপসর্গ
• আক্রান্ত মাংসপেশিতে ব্যথা অথবা অবশ ভাব
• মাংসপেশির দুর্বলতা
• মাংসপেশির দৃশ্যমান ক্ষয় (মাসল অ্যাট্রফি)
• মাংসপেশি শক্ত হয়ে যাওয়া
• অনিচ্ছাকৃত পেশী খিঁচুনি বা মোচড়ানো
• বাকশক্তি হ্রাস পাওয়া
• খাবার গিলতে সমস্যা
• দৃষ্টিশক্তি হ্রাস
• অস্বাভাবিক মাথা ব্যথা
• বমি
প্যারালাইসিস এর প্রকারভেদ
ছোটবেলা থেকে হয়তো জেনে এসেছেন, প্যারালাইসিস মানেই পুরো শরীর অচল হয়ে যাওয়া। আসলে এর পাশাপাশি বিরল কিছু প্যারালাইসিস ছাড়াও সাধারণত ৫ ধরণের প্যারালাইসিসে মানুষ আক্রান্ত হয়। এগুলো নিন্মরূপ:
১. কোয়াড্রিপ্লেজিয়া (Quadriplegia): ঘাড়ের নিচ থেকে শরীর, দুই হাত, দুই পা প্যারালাইজড হয়ে যাওয়াকে কোয়াড্রিপ্লেজিয়া বলা হয়। সাধারণত স্ট্রোক ও স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি হয়ে কোয়াড্রিপ্লেজিয়া হয়ে থাকে।
২. প্যারাপ্লেজিয়া (Paraplegia): দেহের নিন্মাঙ্গের প্যারালাইসিসকে প্যারাপ্লেজিয়া বলা হয়। এই ধরণের প্যারালাইসিসে দুই পা, পায়ের পাতা, গোড়ালি, আঙুল থেকে শুরু করে পেটের অংশও প্যারালাইজড হয়ে যায়।
৩. মনোপ্লেজিয়া (Monoplegia): যখন দেহের একপাশের কোনো একটি অঙ্গে, যেমন একটা হাত বা একটা পায়ে প্যারালাইসিস হয় তখন তাকে মনোপ্লেজিয়া বলা হয়।
৪. ডাইপ্লেজিয়া (Diplegia): যখন প্যারালাইসিসে উভয় পা বা উভয় হাত সমানভাবে আক্রান্ত হয়, কিন্তু অন্যপাশ স্বাভাবিকভাবে কাজ করে তখন তাকে ডাইপ্লেজিয়া বলে।
৫. হেমিপ্লেজিয়া (Hemiplegia): দেহের একই পাশের অর্থাৎ শুধু বাম অথবা ডান পাশের হাত ও পায়ে প্যারালাইসিস হওয়াকে হেমিপ্লেজিয়া বলে। হেমিপ্লেজিয়ায় আক্রান্ত পাশের অন্যপাশ স্বাভাবিকভাবে কাজ করে।
প্যারালাইসিস থেকে সৃষ্ট জটিলতা
• প্যারালাইজড রোগী চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
• প্রস্রাব পায়খানা, গোসল, খাওয়া সব কাজের জন্যই তাকে অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হয়।
• পরনির্ভরশীল জীবনযাপন করতে করতে রোগী খিটখিটে মেজাজের হয়ে পড়েন।
• চিকিৎসার অভাবে আক্রান্ত অঙ্গগুলো শক্ত হয়ে সম্পূর্ণরূপে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
• রোগীর অঙ্গ অচল হওয়ার পাশাপাশি অবশও হয়ে পড়ে।
• বিছানায় দীর্ঘদিন শুয়ে থাকলে তার পিঠে ঘা হয়ে পচন ধরার সম্ভাবনা দেখা দেয়।
প্যারালাইসিসের চিকিৎসা
আমরা আগেই জেনেছি প্যারালাইসিসের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে স্ট্রোক, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি সহ স্নায়ুবিক কিছু রোগ। স্ট্রোক বা স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির হলে যত দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যায় ততোই ক্ষতির পরিমাণ কমে আসে। তাই লক্ষণ দেখা যাওয়ার ৪.৫ ঘণ্টার মধ্যে রোগীকে সিটি স্ক্যান আছে এমন হাসপাতালে নিয়ে যাবেন। হাসপাতালে রোগী একটু ধাতস্থ হলেই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শুরু করতে হবে। যত দ্রুত ফিজিওথেরাপি শুরু করা যায় রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ততো দ্রুত নিয়ে আসা সম্ভব।
প্যারালাইসিসে ফিজিওথেরাপি
বর্তমানে অনেক অত্যাধুনিক ফিজিওথেরাপি ট্রিটমেন্ট রয়েছে যা প্যারালাইজড রোগীকে দ্রুত সুস্থ করে তোলে। প্রয়োজনে পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি রেখে দিনে তিন-চারবার ফিজিওথেরাপি দিতে হবে। সেটা সম্ভব না হলে একজন ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে বাসায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্যারালাইসিস চিকিৎসায় অনেক চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। যেমন বোবাথ, পিএনএফ টেকনিক। এছাড়া প্যারালাইটিক মাংসপেশিতে অথবা মাসল উইকনেসের ব্যবহার করা হয় ইলেকট্রিক্যাল মাসল স্টিমুলেটর (ইএমএস)। আর ট্রান্সকিউটেনিয়াস নার্ভ স্টিমুলেটরের মাধ্যমে স্নায়ুতে উদ্দীপনা তৈরি করা হয়।ফিজিওথেরাপি চিকিৎসায় প্রযুক্তি ব্যবহারের এ অংশটিকে বলা হয় ইলেক্ট্রোথেরাপি। ইলেক্ট্রোথেরাপি ছাড়াও রোগীকে সুস্থ করার জন্য বিভিন্ন থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ বা ব্যায়াম চিকিৎসা করানো হয়। সম্প্রতি জাপানের কাগোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ প্যারালাইসিস রোগীর ওপর ‘কাওয়াহিরা মেথড’ প্রয়োগে যুগান্তকারী সফলতা পেয়েছে।
সুপ্রিয় পাঠক, উপরের আলোচনায় আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যতো দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা হয় রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনাও ততো বেশি।আর এক্ষেত্রে একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের ভূমিকা সম্পর্কেও আপনাকে অবগত করতে সক্ষম হয়েছি বলে মনে করি। প্যারালাইসিস নিয়ে যদি আরও কোনো প্রশ্ন থাকে তাহলে কল করুন আমার হেল্প লাইনে অথবা মেসেজ ইনবক্সে। আপনার যদি কোনো আত্মীয় বা নিকটজন প্যারালাইজড হয়ে থাকেন তাহলে তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
