ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা বিজ্ঞানের এমন একটি বিশেষায়িত শাখা যা এক্সারসাইজ থেরাপি ও ইলেক্ট্রো থেরাপির সমন্বয়ে রোগীর চিকিৎসা করে থাকে। প্রতিবন্ধিতা ও ব্যথা নিরাময়ে এর ভূমিকা অপরিসীম। আমি ডা. গোলজার আহমেদ আজ আপনাদের ফিজিওথেরাপি ও ফিজিওথেরাপিস্টদের ভূমিকা সম্পর্কে নতুন কিছু জানাতে চেষ্টা করবো। লেখাটির মাধ্যমে আপনি জানতে পারবেন ফিজিওথেরাপির আদ্যোপান্ত।
ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সঠিক জ্ঞান না থাকায় অনেক সাধারণ সমস্যাকেও রোগীরা জটিল ভেবে ভয় পেয়ে থাকেন। আমি ডা. গোলজার আহমেদ আপনাদের জন্য সহজ ভাষায় ফিজিওথেরাপি সম্পর্কে লেখাটি লিখেছি। লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়লে ফিজিওথেরাপি ও ফিজিওথেরাপিস্ট সম্পর্কে আপনার ধারণা পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে আমি আশা করছি।
- ফিজিওথেরাপি কী
- ফিজিওথেরাপি কেন প্রয়োজন
- ফিজিওথেরাপিস্ট কে
- কোন কোন রোগে ফিজিওথেরাপি দরকার
- খরচ কেমন
- ফিজিওথেরাপির ইতিহাস
- ফিজিওথেরাপি নিয়ে বিভ্রান্তি
ফিজিওথেরাপি কী
অনেকেই ধারণা করেন ফিজিওথেরাপিতে ফিজিও শব্দের অর্থ শরীর আর থেরাপি অর্থ চিকিৎসা, অর্থাৎ শারীরিক চিকিৎসা। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। ফিজিও অর্থ আপাতদৃষ্টিতে শরীর প্রাসঙ্গিক মনে হলেও এখানে এর অর্থ তা নয়। ফিজিও শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ Phusis থেকে। যার অর্থ প্রকৃতি। এই একই শব্দ থেকে ফিজিক্স শব্দটিরও উৎপত্তি হয়েছে। ফিজিও বলতে চিকিৎসার এমন কিছু উপায় বা পদ্ধতির সম্পর্কে বর্ণনা করে যার সাথে সরাসরি প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক রয়েছে। তার মানে সহজেই বোঝা যাচ্ছে এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান যেমন, গতি, বল, চাপ, তাপ, শব্দ, আলো ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। আর থেরাপি শব্দটিও এসেছে গ্রীক শব্দ Therapeia থেকে, যার অর্থ নিরাময়। সুতরাং ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা এমন একটি পদ্ধতি যা প্রাকৃতিক উপাদানের সর্বাধুনিক প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো প্রকার ওষুধ ছাড়াই অচল, অক্ষম কিংবা ব্যথায় কাতর রোগীকে স্বাভাবিক সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনে।
ফিজিওথেরাপি কেন প্রয়োজন
সাধারণ চিকিৎসার ধারণা থেকে আপনার মনে হতে পারে অসুখ হলেই হয় ওষুধ খেতে হবে, নয় তো সার্জারি করতে হবে। কিন্তু আমাদের শরীরে এমন কিছু সমস্যা তৈরি হয় যার চিকিৎসায় ওষুধ খেলে ব্যথা কমবে ঠিকই কিন্তু ওষুধ খাওয়া ছাড়লে তা বেড়ে যায়। এই ধরণের সমস্যাগুলো মূলত জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধি, মাংসপেশি, স্নায়ু সংক্রান্ত। এই সমস্যাগুলো ওষুধের মাধ্যমে সারিয়ে তোলা অসম্ভব। এগুলো সারিয়ে তুলতে আপনাকে ফিজিওথেরাপি নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে সার্জারির প্রয়োজনীয়তাকেও পূরণ করে ফিজিওথেরাপি। এতে কাজ না হলে ক্ষেত্র বিশেষে সার্জারির প্রয়োজন হলেও, সেসব ক্ষেত্রে সার্জারির পর অবশ্যই ফিজিওথেরাপি নিতে হয়।
ফিজিওথেরাপিস্ট কে
ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শিক্ষায় ৫ বছর মেয়াদী স্নাতক (বিপিটি) সনদ প্রাপ্ত চিকিৎসককে ফিজিওথেরাপিস্ট বলা হয়। খেলার মাঠে কর্মরত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের সংক্ষেপে ফিজিও বলে ডাকা হয়। তারা ধাপে ধাপে রোগীর রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন করে থাকেন। এখানেই শেষ নয়। ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীকে এমন কিছু পদ্ধতি শিখিয়ে বাড়িতে পাঠান যা পরবর্তীতে রোগীর সমস্যা আবার ফিরে আসা থেকে রক্ষা করে।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, ফিজিওথেরাপিস্ট পরিচয়ে অনেককে অবৈধভাবে চিকিৎসা দিতে দেখা যায়। তাদের চিকিৎসায় অনেক দুর্ঘটনার খবরও পাওয়া যায় প্রায়ই। আবার অনেক খবরও থাকে অন্তরালে। কিন্তু এদের অপচিকিৎসায় রোগীদের অপূরণীয় ক্ষতি হওয়। অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতির কথা তো বলাই বাহুল্য।
কোন কোন রোগে ফিজিওথেরাপি দরকার
অনেক সময় অন্য স্পেশালিটির চিকিৎসকরাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন কোন রোগে কখন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিতে হবে। তাই তারা ব্যথার ওষুধ দিয়ে রোগ সারার চেষ্টা করতে থাকেন। অথচ দীর্ঘদিন ব্যথার ওষুধ খেতে খেতে রোগীর পাকস্থলীতে আলসার ও কিডনি বিকলসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। চলুন জেনে নিই কোন কোন রোগে আপনার এই চিকিৎসা প্রয়োজন পড়বে।
বাত, ব্যথা ও প্যারালাইসিস এই তিনটি শব্দের ব্যবহার ফিজিওথেরাপিতে সব চেয়ে বেশি। অর্থাৎ এই তিনটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ঠিক কোন কোন রোগের চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপিস্টের কাছে আসতে হবে।
বিভিন্ন প্রকার বাত ব্যথা যেমন, ঘাড়, কোমর, হাঁটু, কাঁধ, হাতের কুনই, গোড়ালি ও পিঠ ব্যথা, স্ট্রোক প্যারালাইসিস, বেলস পালসি, স্পোর্টস ইনজুরি, অটিজমসহ নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার, অর্থোপেডিকস কন্ডিশন, প্রতিবন্ধতা ইত্যাদিতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রয়োজন। এছাড়াও এই লিঙ্কে ক্লিক করে দেখে নিতে পারেন বিস্তারিত।
খরচ কেমন
এই চিকিৎসা ব্যবস্থায় খরচ কেমন এটা আলোচনা করা একটু কঠিন। কারণ একেক সমস্যার একেক রকম চিকিৎসা। কোন রোগে কী চিকিৎসা হবে তা নির্ধারণ করার পর এর খরচ সম্পর্কে বলা যাবে। তবুও আপনাদের সুবিধার্থে এই লিঙ্কে কিছু খরচ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আপনি আমাদের হেল্প লাইন নম্বরেও কল করে ধারণা নিতে পারেন।
ফিজিওথেরাপির ইতিহাস
ফিজিওথেরাপি নামকরণের ইতিহাস (১৮৫১) খুব বেশি দিন আগের না হলেও এর ইতিহাস আনুমানিক দুই হাজার ৪’শ বছরের পুরনো। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬০ সালের দিকে এবং পরে গেইলিয়াসের হাত ধরে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা বিজ্ঞানে অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন সফট টিস্যু মোবিলাইজেশন, ম্যানুয়াল থেরাপি, হাইড্রো থেরাপি ইত্যাদি ব্যবহার করে সেই প্রাচীন আমলে তারা ফিজিওথেরাপির সূচনা করেন।আমাদের চটকদার সংগ্রহের সাথে আপনার শৈলী উন্নত করুন smartwatchesstraps, ফ্যাশন-ফরোয়ার্ড প্রযুক্তিবিদদের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে যারা নান্দনিকতার সাথে আপস করতে অস্বীকার করে। আপনার স্মার্টওয়াচ প্রতিটি পোশাকের পরিপূরক নিশ্চিত করে কার্যকারিতা এবং ফ্লেয়ারের নিখুঁত মিশ্রণ আবিষ্কার করুন। আজ নতুনত্ব এবং শৈলী আলিঙ্গন!
বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপির গোড়াপত্তন করেন ফিজিওথেরাপিস্ট অধ্যাপক ডা. আবুল হোসেন। তিনি ১৯৬০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফিজিওথেরাপি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে যে বিভাগটির নাম পরিবর্তন করে ফিজিক্যাল মেডিসিন এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ফিজিওথেরাপির প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর। সেসময় মুক্তিযুদ্ধে আহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসায় এর প্রয়োজন দেখা দেয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ ডা. আর জে গারস্ট যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা করেন।
ফিজিওথেরাপি নিয়ে বিভ্রান্তি
অনেক চিকিৎসক রোগীদের কিছু ইলেক্ট্রোথেরাপি প্রেসক্রাইব করেন যা অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের কাছে রোগীরা এসে বিভিন্ন মেশিন সম্পর্কে খোঁজ করেন। যেন মেশিনগুলোই তাদের রোগ সারাবে। তারা যেগুলোকে মেশিন বলেন, সেগুলো মূলত ইলেক্ট্রোথেরাপিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ডিভাইস ও প্রযুক্তি। এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে রোগীরা যেমন সুস্থ হন, তেমনি অপব্যবহার বা ভুল ব্যবহারে পঙ্গুও হয়ে যেতে পারে রোগীরা। আর ফিজিওথেরাপি মানে শুধুই তথাকথিত মেশিনের ব্যবহার নয়। সঠিক রোগ নির্ণয়, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান অনুযায়ী ম্যানুয়াল থেরাপি, ম্যানিপুলেটিভ থেরাপি, মোবিলাইজেশন, মুভমেন্ট, জয়েন্ট ইনজেকশন, পশ্চারাল এডুকেশন, হাইড্রোথেরাপি, ড্রাই নিডেলিং, ট্রাকশন, লেজার থেরাপি, ইলোকট্রোথেরাপি ইত্যাদির মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা ও পুনর্বাসন করা হলো ফিজিওথেরাপি।
ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ ছাড়া অপেশাদার কারও কাছে মেশিন ব্যবহার করলে রোগও সারবে না, পয়সাও নষ্ট হবে। এক্ষেত্রে আমি অন্যান্য চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানাই, কারও চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রয়োজন মনে করলে ফিজিওথেরাপিস্টকে রেফার করুন। আর রোগীরা অবশ্যই যেন দেখে নেন, যিনি আপনার ফিজিওথেরাপি চিকিৎসায় দিচ্ছেন, তিনি বিপিটি বা বিএসপিটি পাশ করা কি না। মনে রাখবেন, ইউটিউবে দেখে চিকিৎসামূলক ব্যায়াম অথবা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ ছাড়া অন্য কারও পরামর্শ আপনাকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
ধন্যবাদ সময় নিয়ে লেখাটি পড়ার জন্য। আশা করি ফিজিওথেরাপি সম্পর্কে আপনাকে যথাযথ তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে পেরেছি। এ সম্পর্কে সম্পর্কে জানতে ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে যোগাযোগ করুন আমার হেল্প লাইনে অথবা মেসেজ ইনবক্সে।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
