ওষুধে ব্যথা সারলেও সব ব্যথায় ওষুধ খাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আপনি হয়তো জানেন না ব্যথার ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অন্যান্য অনেক রোগের জন্ম দেয়। তাহলে ব্যথা সারবে কী করে? আপনার জন্য সুখবর হলো ওষুধের চেয়েও নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা আপনার হাতের নাগালেই রয়েছে। এমনই একটি চিকিৎসা হচ্ছে ফিজিওথেরাপি।
আমি ডা. গোলজার আহমেদ ব্যথার ওষুধের চেয়ে কেন ফিজিওথেরাপি নিরাপদ ও কার্যকর তা এই লেখায় জানাতে চেষ্টা করবো। আমি আশা করি এই লেখাটি ব্যথার ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আপনার চোখ খুলে দেবে।
- ব্যথার প্রকারভেদ
- কেন ব্যথার ওষুধ খেতে হয়
- ব্যথার ওষুধ কীভাবে কাজ করে
- ব্যথার ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া
- ব্যথার ওষুধের অপব্যবহার
- ব্যথার ওষুধ বনাম ফিজিওথেরাপি
- ফিজিওথেরাপির কার্যকরিতা
- কোথায় নেবেন ফিজিওথেরাপি
ব্যথার প্রকারভেদ
শারীরিক কিংবা মানসিক সে যে ব্যথাই হোক না কোনো, ব্যথার অনুভূতি হয়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না পৃথিবীতে। আজকের আলোচ্য সূচীতে মানসিক ব্যথা নেই, তাই আমি শরীরের ব্যথা নিয়েই আলোচনা করবো। আমাদের দেহের ব্যথাগুলোকে প্রধানত ৪টি ভাগে বিভক্ত করা যায়। প্রধান ব্যথাগুলো নিন্মরূপ-
১. মাংসপেশি ও হাড়ের ব্যথা
২. শরীরের ভিতরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ব্যথা
৩. স্নায়ুজনিত ব্যথা
৪. রক্ত চলাচলে সমস্যা হওয়ায় সৃষ্ট ব্যথা
এর বাইরে একটি ভয়ঙ্কর ব্যথা রয়েছে যাকে ইফার্কশন পেইন বলা হয়। এটা সাধারণত রক্তনালীর কোনো রোগে হয়ে থাকে।
কেন খেতে হয় ব্যথার ওষুধ
ব্যথা আমাদের দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অনুভূতি। যখনই কোনে অঙ্গে সমস্যা হয় তখন সেখানে ব্যথার অনুভূতি সৃষ্টি হয় এবং মস্তিষ্ককে জানান দেয় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। ব্যথার ওষুধ সেই দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ব্যথা কমায়।
ব্যথার ওষুধের প্রকারভেদ
ব্যথার ওষুধকে মেডিকেলের ভাষায় বলা হয় অ্যানালজেসিক। চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নতির ধারাবাহিকতায় ব্যথার ধরন ও স্থানের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরণের ব্যথার ওষুধ আবিষ্কার করেছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। তবে সব ওষুধই ৩টি ভাবে কাজ করে।
১. কেন্দ্রীয় ভাবে কার্যকর: এই ব্যথার ওষুধগুলোকে সেন্ট্রালি অ্যাকটিং পেইন কিলার বা অপিওয়েড বলা হয়। মস্তিষ্ক বা স্পাইনাল কর্ডের উপর কাজ করার মাধ্যমে ব্যথা কমায়। মরফিন, প্যাথেডিন, ন্যালবিউফিন, ট্রামাডল ইত্যাদি সুপরিচিত ওষুধগুলো এই বিভাগের অন্তর্ভুক্ত।
২. স্থানীয়ভাবে কার্যকর: যেখানে ব্যথা সেখানেই কেবল কাজ করে এমন ওষুধগুলোকে লোকালি অ্যাক্টিং বা স্থানীয়ভাবে কার্যকর ওষুধ বলে। সাধারণত এই ওষুধগুলোই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ওষুধ হলো- নন স্টেরয়েড অ্যান্টিইনফ্লামেটরি ড্রাগ বা NSAID। এছাড়াও রয়েছে Beklcfen, Tiemonium, Hysomide ইত্যাদি।
৩. ব্যথা পরিবর্তনকারী মাধ্যম: এই ওষুধগুলো ব্যথার মাত্রা কমায় কিংবা ব্যথার ধরন পাল্টে রোগীকে স্বস্তি দেয়। এরা পেইন মোডিফাইং এজেন্ট হিসাবে পরিচিত। ওষুধগুলোর মধ্যে রয়েছে এমিট্রিপ্টাইলিন, সার্টালিন, ডায়াজেপাম, ডুলোক্সেটিন ইত্যাদি।
ব্যথার ওষুধ কীভাবে কাজ করে
সাধারণত দ্রুত ব্যথা মুক্তির জন্য মানুষ ব্যথার ওষুধের উপর নির্ভর করে। ব্যথার ওষুধ রক্তের মাধ্যমে দেহের বিভিন্ন কোষে পৌঁছিয়ে সেখানে প্রয়োজনীয় রাসায়নিকের নিঃসরণ ঘটায়। এরপর পেইন গেইট থিওরির মত বিভিন্ন মেকানিজমের মাধ্যমে ব্যথার স্থানের ব্যথা কমানোর কাজ শুরু করে।
ব্যথার ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
যেকোনো ওষুধেরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে একটি ওষুধের সবটুকু সবসময় কাজেও লাগে না। ফলে ওষুধগুলো পাকস্থলী, যকৃত ও কিডনির উপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ব্যথার ওষুধ সেবন বা প্রয়োগের কারণে পাকস্থলীতে ক্ষত এবং কিডনির স্থায়ী ক্ষতি হয়। এর ফলে আপনি হজমের সমস্যা থেকে শুরু করে আলসার এবং কিডনি বিকলের মত পরিস্থিতির শিকার হতে পারেন।
ব্যথার ওষুধের অপব্যবহার
সবসময়ই চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খাওয়া উচিৎ। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যথা হলেই ওষুধের দোকানদারের পরামর্শে ওষুধ সেবনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। দীর্ঘমেয়াদে এর কোনো ভালো ফল হয় না। দোকানদার আপনার ব্যথা নিরাময়ে তার সুনাম বাড়ানোর জন্য এমন কোনো ওষুধের পরামর্শ দেবে যা আপনার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথার ওষুধসহ অন্য কোনো ওষুধই গ্রহণ করবেন না।
ব্যথার ওষুধ বনাম ফিজিওথেরাপি
সারা বিশ্ব এখন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। উপরের আলোচনায় এটা সহজেই বুঝে গেছেন আদতে ব্যথার ওষুধ কতটা ভয়ঙ্কর। সাময়িক ব্যথা নিরাময়ে চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যথার ওষুধ সেবন করতে পারেন। কিন্তু মাংসপেশি ও হাড় এবং স্নায়ুজনিত ব্যথার ক্ষেত্রে ব্যথার ওষুধের চেয়ে ভালো কোন উপায় আপনাকে গ্রহণ করতেই হবে। এজন্য বিশেষজ্ঞরা মাংসপেশি ও হাড় এবং স্নায়ুজনিত ব্যথায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ফিজিওথেরাপি (ফিজিওথেরাপির আদ্যোপান্ত লিঙ্ক) একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন চিকিৎসা পদ্ধতি। এই চিকিৎসায় ব্যথা নয়, ব্যথার কারণ নির্ণয় করে তা সারিয়ে তোলেন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকরা।
ফিজিওথেরাপির কার্যকারিতা
হাড় ও মাংসপেশির ব্যথায় সঠিক ফিজিওথেরাপির কার্যকরিতা শতভাগ। ফিজিওথেরাপি কেবল চিকিৎসাই করে না, রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিতে করণীয় সব রকম পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যায়। ফিজিওথেরাপি আপনাকে ব্যথার ওষুধের উপর নির্ভরশীলতা মুক্ত করবে। ফলে আপনার পাকস্থলী, যকৃত বা কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না। তবে ফিজিওথেরাপির পূর্ণাঙ্গ সুফল পেতে আপনাকে অনেক সাবধানে এগুতে হবে। অনেক সময় ভুয়া ফিজিওথেরাপিস্টের পাল্লায় পড়ে রোগীরা আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। সেক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
কোথায় নেবেন ফিজিওথেরাপি
ফিজিওথেরাপি দিন দিন জনপ্রিয় হওয়ায় দেশের আনাচে-কানাচে অযোগ্য ও ভুয়া লোকজন অসংখ্য ফিজিওথেরাপি সেন্টার গড়ে তুলেছে। এসব সেন্টারে বিপিটি বা এমপিটি পাশ করা ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। তাই আপনি কোনো ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে গেলে সবার আগে দেখবেন সেখানে অন্তত বিপিটি বা বিএসপিটি ফিজিওথেরাপিস্ট আছেন কিনা। যদি না থাকে তাহলে অবশ্যই সেখানে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিতে যাবেন না। মনে রাখবেন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রদানের জন্য একমাত্র বিপিটি বা বিএসপিটি ফিজিওথেরাপিস্টই স্বীকৃত।
ধন্যবাদ এতক্ষণ ধরে আমার লেখাটি পড়ার জন্য। আমি আশাকরি এই লেখা থেকে ব্যথার ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আপনি সচেতন হয়েছেন। লেখাটি আপনার পরিবার, বন্ধু, স্বজনদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন। হয়তো তারাও আপনার শেয়ার করা লেখাটি থেকে উপকৃত হবেন। ফিজিওথেরাপি নিয়ে আরও বিস্তারিত জানতে ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে যোগাযোগ করুন আমার হেল্প লাইনে অথবা মেসেজ ইনবক্সে।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
