স্পাইনাল কর্ডকে বাংলায় ‘মেরুরজ্জু’ বলা হয়। রজ্জু মানে দড়ি। মেরুরজ্জুতে অনেকগুলো স্নায়ু থাকে। যে কোনো শারীরিক অনুভূতি যেমন স্পর্শ, তাপ, চাপ, আঘাত ইত্যাদি আমাদের মস্তিষ্কে পৌঁছায় সেগুলোই হলো স্নায়ু। সুতরাং বুঝতেই পারছেন মেরুরজ্জু বা স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে।
স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির কারণে রোগী প্যারালাইসিস থেকে শুরু করে প্রতিন্ধীতাও বরণ করতে পারেন। এজন্য প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা। আমি ডা. মো: গোলজার আহমেদ , এই লেখায় স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিতে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি। আসুন লেখাটি শেষ পর্যন্ত ধৈর্য সহকারে পড়ি।
- স্পাইনাল কর্ড কী
- স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি কেন হয়
- স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি হলে কী হয়
- স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি কত প্রকার
- কখন ডাক্তার দেখাবেন
- আহত রোগীকে করণীয়
- স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি পরীক্ষা
- স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিতে ফিজিওথেরাপি
- জরুরি পরামর্শ
স্পাইনাল কর্ড কী
স্পাইনাল কর্ড হলো মস্তিষ্ক থেকে মেরুদণ্ডের ভিতর দিয়ে নেমে আসা লম্বা দড়ির মত একটি স্নায়ুগুচ্ছ। ৩১ জোড়া স্নায়ু মিলে তৈরি হয়েছে এই স্নায়ুগুচ্ছ। স্নায়ুগুলো শরীর থেকে তথ্য মস্তিষ্কে এবং মস্তিষ্ক থেকে শরীরে অনুভূতি, সিদ্ধান্ত ইত্যাদি আদান প্রদান করে। এই স্নায়ুগুলোর সচল কর্মকাণ্ডের কারণে আপনি-আমি অনুভূতি পাই এবং শরীর নাড়াতে পারি। এই মেরুরজ্জুকে মেনিনজেস নামক একধরণের আবরণ এবং মেরুদণ্ডের হাড় ঘাড় থেকে কোমর পর্যন্ত ঘিরে রাখে। এতে মেরুরজ্জু খুব নিরাপদে থাকে।
স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি কেন হয়
অধিকাংশ স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি মেরুদণ্ডে হঠাৎ দুর্ঘটনাজনিত আঘাতের কারণে হয়ে থাকে। এতে মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে ভেতরের স্পাইনাল কর্ড বা মেরুরজ্জুর স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মটর সাইকেল বা গাড়ি দুর্ঘটনা, উঁচু জায়গা থেকে পড়ে যাওয়া, অনেক ভারি কিছু তোলার চেষ্টা করার কারণে স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি সবচেয়ে বেশি হয় সারা বিশ্বে। এছাড়াও নিন্মোক্ত কারণগুলোও স্পাইনাল ইনজুরির জন্য দায়ী।
• উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া
• শরীরচর্চায় দুর্ঘটনা
• অগভীর পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আঘাত
• গুলেন বেবি সিনড্রোম
• ট্রান্সভার্স মাইলাইটিস
• মেরুদণ্ড টিউমার ও ক্যান্সার
• মেরুদণ্ডের টিভিএস পাইন
• ভ্যাকসিনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া
• পিঠে আঘাত পাওয়া ইত্যাদি।
স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি হলে কী হয়
স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি হলে পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস হয়ে যেতে পারে অনেক সময়। এছাড়াও থেকে নিম্নোক্ত সমস্যাগুলো তৈরি হয়ে থাকে।
• ঘাড়ে, পিঠে বা মাথায় দংশনের মত তীব্র ব্যথা
• শ্বাস-প্রশ্বাস ও হাঁচি-কাশিতে সমস্যা
• হাঁটা-চলায় ভারসাম্যহীনতা
• হাত-পা ও আঙুলে ঝিনঝিন অনুভূতি
• বিশেষ বিশেষ অঙ্গ সঞ্চালনে অক্ষমতা
• প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা
• স্পর্শ, তাপ, চাপ ইত্যাদি অনুভূতি হারানো
• শরীর ঝাঁকুনি এবং পেশী সংকোচন
• যৌন ও প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং যৌন অনুভূতি নষ্ট হওয়া ইত্যাদি।
স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি কত প্রকার
ইনজুরির প্রকরণ ২টি বিষয়ের উপর নির্ভর করে: কোথায় ইনজুরি হয়েছে এবং ইনজুরির মাত্রা কতখানি। ইনজুরির পর অঙ্গ সঞ্চালনে অসুবিধার উপর একে ২টি ভাগে ভাগে ভাগ করা হয়।
• সম্পূর্ণ: যদি আপনার সব অনুভূতি এবং অঙ্গ সঞ্চালনার ক্ষমতা নষ্ট হয় তাহলে তাকে সম্পূর্ণ অক্ষম হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।
• অসপূর্ণ: যদি আহত অংশ যেসব অঙ্গের অনুভূতি বা কর্মক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে সেসব অঙ্গের অনুভূতি নষ্ট হয় তাহলে তাকে অসম্পূর্ণ অক্ষমতা বলা হয়।
এর পাশাপাশি স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি থেকে সৃষ্ট অক্ষমতা বা পক্ষাঘাত ২ রকম হতে পারে:
• টেট্রাপ্লেজিয়া: কোয়াড্রিপ্লেজিয়া নামেও এটি পরিচিত। কোয়াড্রি মানে ৪। অর্থাৎ স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি হলে ৪ হাত পাসহ মেরুদণ্ড এবং শ্রোণীচক্রের অঙ্গাদি আক্রান্ত হয়।
• প্যারাপ্লেজিয়া: পুরো মেরুদণ্ড বা এর অংশ বিশেষসহ পায়ের ও শ্রোণীচক্রের অঙ্গাদি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হলে তাকে প্যারাপ্লেজিয়া বলে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন
মাথা বা ঘাড়ে মারাত্মকভাবে আঘাত পেলে দ্রুত স্পাইনাল কর্ডে ইনজুরি হয়েছে কিনা তা নির্ণয় করা জরুরি। এটা এজন্য জরুরি যে স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির চিকিৎসা যত দ্রুত শুরু করা যায় ততো ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব। নইলে রোগী সাথে সাথে বা ধীরে ধীরে অনুভূতি হারিয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতে পারে। আহত হওয়া এবং চিকিৎসা শুরুর মধ্যবর্তী সময়ের উপর নির্ভর করে রোগী সুস্থ হতে কতটা সময় লাগবে।
আহত রোগীকে করণীয়
কেউ মারাত্মকভাবে আহত হলে করণীয় নিয়ে দুর্ভাবনায় পড়েন অনেকে। রোগীর যদি জ্ঞান থাকে তাহলে-
• তাকে নড়াচড়া করতে নিষেধ করুন।
• ৯৯৯ এ কল করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন।
• মাথার কাছে বসে তার মাথা সোজা রাখতে সাহায্য করুন।
• মাথা এমন ভাবে ধরুন যেন তার মেরুদণ্ড, ঘাড় আর মাথা একই লাইনে থাকে।
• অ্যাম্বুলেন্স না আসা পর্যন্ত তাকে এভাবে ধরে থাকুন।
আর যদি জ্ঞান না থাকে তাহলে-
• শ্বাস-প্রশ্বাস করছে কি না তা পরীক্ষা করুন।
• মুখ লেগে গেলে তা খোলার ব্যবস্থা নিন।
• মুখ একটু খুলে গেলে দাঁতের মাঝে আঙুল দিয়ে তাকে শ্বাস-প্রশ্বাসে সহযোগিতা করুন।
• যদি নিজ থেকে শ্বাস করতে না পারে তাহলে সিপিআর বা কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করুন।
স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির পরীক্ষা
চিকিৎসকরা বেশ কিছু ধারাবাহিক পরীক্ষার মাধ্যমে স্নায়ুবিক অবস্থা এবং ইনজুরির ধরণ নির্ণয় করে থাকেন। এছাড়াও অধিকতর নিশ্চিত হতে রোগীর মাথা, ঘাড় ও পিঠের এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই ইত্যাদি করানো হয়।
স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপি
অক্ষমতা বা পক্ষাঘাতের মাত্রা ও ধরণ অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। আঘাতের স্থান ও প্রকৃতির উপরও চিকিৎসা নির্ভর করে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য থাকে রোগীকে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরেয়ে আনা। এই ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি সবচেয়ে কার্যকরী চিকিৎসা পদ্ধতি। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকগণ রোগীকে যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে তার শক্তি, সামর্থ্য, রেঞ্জ অব মোশন, কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য চিকিৎসা করেন। দৈনন্দিন কাজ কর্ম (Activities of daily living) স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির রোগীর জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। সঠিক ফিজিওথেরাপি এবং অকুপেশনাল থেরাপির মাধ্যমে একজন রোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। তাই যতো দ্রুত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শুরু করা যায় রোগীর জন্য ততো ভালো।
জরুরি পরামর্শ
• গাড়ি চালানোর সময় সিট বেল্ট বেধে নিতে হবে।
• মোটরসাইকেল চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার করতে হবে।
• অতিরিক্ত ওজনের কিছু তোলা যাবে না।
• উঁচু জায়গা থেকে লাফ দেওয়া যাবে না।
• খেলাধুলার সময় যথাযথ নিরাপত্তা ও সতর্কতা নিয়ে খেলতে হবে।
প্রিয় পাঠক, আশা করি এই লেখার মাধ্যমে স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দিতে পেরেছি। স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিসহ যেকোনো ইনজুরি নিয়ে যদি কোনো প্রশ্ন থাকে তাহলে কল করুন আমার হেল্প লাইনে অথবা মেসেজ ইনবক্সে। ধন্যবাদ শেষ পর্যন্ত লেখাটি পড়ার জন্য। আপনার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
