আমাদের ঘাড় মেরুদণ্ডের প্রথম ৭টি কশেরুকা, এদের মধ্যবর্তী চাতকি বা ডিস্ক, মাংসপেশি, লিগামেন্ট, স্নায়ু ও রক্তনালীর সমন্বয়ে গঠিত। ঘাড় মূলত আমাদের মাথার ওজন বহন এবং মাথাকে সঠিক অবস্থানে রেখে ঘোরাতে সাহায্য করে। যে কোনো অস্বাভাবিকতা, প্রদাহ, অথবা আঘাত ঘাড়ের ব্যথা কারণ হতে পারে।
প্রতিদিন আমার কাছে এমন অনেক রোগী আসেন যারা দীর্ঘদিন চিকিৎসা করেও ঘাড় ব্যথা থেকে মুক্ত হতে পারেননি। আমি ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ ডা. গোলজার আহমেদ ঘাড় ব্যথা নিয়ে আপনাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে এই লেখাটি সাজিয়েছি। চলুন পড়ে নিই শেষ পর্যন্ত।
- ঘাড় ব্যথা হলে যেসব উপসর্গ দেখা দেয়
- ঘাড় ব্যথা যেসব কারণে হয়
- কখন ডাক্তার দেখাবেন
- চিকিৎসা
অনেক মানুষ মাঝে মধ্যেই ঘাড় ব্যথা বা ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার সমস্যায় ভোগেন। অধিকাংশ সময় ঘাড় ব্যথা তেমন গুরুতর রূপ নেয় না এবং অল্প কিছু দিনেই সেরে যায়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঘাড় ব্যথার জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। যদি আপনার তীব্র ঘাড় ব্যথা ১ সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে যন্ত্রণা দেয় তাহলে জরুরি ভিত্তিতে একজন অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ঘাড় ব্যথা হলে যেসব উপসর্গ দেখা দেয়
ঘাড় ব্যথার উপসর্গ এর তীব্রতা ও স্থায়িত্বের উপর নির্ভর করে। স্বল্পমাত্রার ব্যথা কয়েক দিন বা সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই ভালো হয়ে যায়। এই ধরণের ব্যথায় স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে তেমন ব্যাঘাত ঘটে না।
তবে চিকিৎসা না করালে ব্যথা তীব্র ব্যথা আপনার দৈনন্দিন কাজের সমস্যা হওয়া থেকে শুরু করে প্রতিবন্ধীতার কারণও হতে পারে। এ ব্যথার উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে:
ঘাড় নাড়াতে না পারা: রোগীরা এ ধরণের উপসর্গ নিয়ে আসেন যে তাদের ঘাড় শক্ত হয়ে গেছে এবং ব্যথার কারণে ঠিক মত নাড়াতে পারছে না।
তীক্ষ্ণ ব্যথা: ঘাড়ের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ছুরি চালানোর মত তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভূত হয়।
নাড়াচাড়ায় ব্যথা: স্বাভাবিকভাবে ঘাড় নাড়াচাড়া করতে গেলে ডানে বা বামে কিংবা উপরে বা নিচে ব্যথা অনুভব হয়ে থাকে।
ব্যথা ছড়িয়ে পড়া বা অবশ হওয়া: প্রায়ই ঘাড়ের ব্যথা মাথা, পিঠ, কাঁধ, ও হাতে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। ব্যথার কারণ যদি স্নায়ুতে চাপের কারণে হয়ে থাকে তাহলে অবশ হওয়া, অসাড় বোধ করা বা হাতে শক্তি না পাওয়ার মত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
মাথা ব্যথা: যে ব্যথা ঘাড়ে উৎপন্ন হয়, তা মাথা ব্যথাও সৃষ্টি করতে পারে। যার নাম সার্ভিকোজেনিক হেডঅ্যাক। তবে অনেক সময় মাইগ্রেনের ব্যথার উপসর্গও একই হতে পারে।
ঘাড় ব্যথার কারণ
ঘাড় ব্যথার নানা কারণ রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- খারাপ দেহ-ভঙ্গিমা;
- বিরতিহীনভাবে ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটারে কাজ করা;
- ফোনের দিকে দীর্ঘ সময় ঝুঁকে থাকা;
- সেলুনের বডি মাসাজ;
- বাস বা গাড়িতে জোরে ঝাঁকুনি;
- খেলাধুলা বা দুর্ঘটনায় আঘাত পাওয়া;
- মেনিনজাইটিস;
- হার্টের সমস্যা;
- আর্থ্রাইটিস বা বাত;
- অস্টিওপরোসিস;
- ফাইব্রোমায়ালজিয়া;
- স্পন্ডাইলোসিস;
- পিএলআইডি;
- স্পাইনাল স্টেনোসিস;
- জন্মগত সমস্যা;
- ফোঁড়া;
- টিউমার;
- মেরুদণ্ডের ক্যান্সার।
কখন ডাক্তার দেখাবেন
যদি ব্যথা ১ সপ্তাহের বেশি থাকে তাহলে একজন অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এছাড়াও যদি নিন্মলিখিত সমস্যাগুলো থাকে তাহলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
- কোনো কারণ ছাড়া ব্যথা;
- ঘাড়ে কোনো পিণ্ড;
- জ্বর;
- মাথা ব্যথা;
- গ্রন্থি ফুলে ওঠা;
- বমিভাব;
- বমি হওয়া;
- খাবার গিলতে ও নিঃশ্বাস নিতে সমস্যা হওয়া;
- দুর্বলতা;
- অবশ হওয়া;
- হাত নাড়তে সমস্যা হওয়া হওয়া;
- কোনো জিনিস ধরতে কষ্ট হওয়া ইত্যাদি।
চিকিৎসা
ঘাড় ব্যথা নিয়ে ফিজিওথেরাপিস্টের কাছে গেলে তিনি যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যথার ধরন নির্ণয় করার পর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন রোগীকে সুস্থ করে তোলার জন্য কী কী চিকিৎসা প্রদান করতে হবে। রোগীর সাথে কথা বলা, তার পেশা, জীবনযাপনের ধরন ও প্রধান সমস্যা সম্পর্কে জানা, ঘাড়ের অ্যাসেসমেন্ট,রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে, সিটি-স্ক্যান, এমআরআই স্ক্যান, ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি, লাম্বার পাংচার ইত্যাদির মাধ্যমে সঠিক রোগ নির্ণয় করা হয়। নির্ণীত কারণ যদি ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে যদি চিকিৎসা সম্ভব না হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে রেফার করা হয়ে থাকে। আর যদি কারণ অনুসন্ধানের পর দেখা যায় যে ঘাড় ব্যথা সারাতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাই লাগবে, সেক্ষেত্রে নিন্মলিখিত থেরাপিউটিক মেথড গ্রহণ করা হয়।
- থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ
- রিপিটেড রিট্রাকশন এক্সারসাইজ
- স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ
- হিট ও কোল্ড থেরাপি
- ‘চিন টাক’ এক্সারসাইজ
- মাংসপেশির স্ট্রেচিং
- নিউরোডায়নামিকস
- ইলেক্ট্রোথেরাপি।
ঘাড় ব্যথাসহ যে কোনো ব্যথায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অনেক রোগী উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিভিন্ন ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করে থাকেন। এতে স্থায়ী কোনো সমাধান না হয়ে বরং কিডনি, পাকস্থলী ও যকৃতের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়।তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ব্যথার ওষুধ সেবন করা ঠিক নয়। আর ঘাড় ব্যথায় আক্রান্ত হলে প্রথমেই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ফিজিওথেরাপি একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন চিকিৎসা যেখানে কোনো সিনথেটিক ওষুধ ব্যবহার করা হয় না।
প্রিয় পাঠক, আশা করি ঘাড় ব্যথা সম্পর্কে আপনাদের যতটুকু জিজ্ঞাসা থাকতে পারে তার সবটুকু এই লেখায় উঠে এসেছে। এরপরও যদি কোনো প্রশ্ন থাকে তাহলে কল করুন আমার হেল্প লাইনে অথবা মেসেজ ইনবক্সে।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
