You are currently viewing মেরুদণ্ড ব্যথা হলে আপনার করণীয়
শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ মানুষের জীবনের কোনো না কোনো সময়ে মেরুদণ্ড ব্যথা হয়ে থাকে। ২২-৪৮% মানুষ এক মাসের ভেতর মেরুদণ্ডের কোনো না কোনো ব্যথায় ভোগে।

মেরুদণ্ড ব্যথা হলে আপনার করণীয়

মেরুদণ্ড আমাদের দেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এটি একাধারে দেহের ভার বহন করে ও পুরো শরীর সোজা ধরে রাখে। গবেষণা বলছে শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ মানুষের জীবনের কোনো না কোনো সময়ে মেরুদণ্ড ব্যথা হয়ে থাকে। যেকোনো সমস্যা যা মেরুদণ্ডের সাথে সম্পর্কযুক্ত, বিশেষ করে ঘাড়ে, পিঠে বা কোমরের সাথে সম্পর্কযুক্ত তাকে মেরুদণ্ডের সমস্যা বলা হয়ে থাকে।

মেরুদণ্ড ব্যথা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। আর বেশির ভাগ মানুষেরই এ ব্যথার অভিজ্ঞতা আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২২ থেকে ৪৮ শতাংশ মানুষ এক মাসের ভেতর মেরুদণ্ডের কোনো না কোনো ব্যথায় ভোগে। আমি ডা. মো: গোলজার আহমেদ, এই লেখায় মেরুদণ্ডের ব্যথা থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি। আসুন লেখাটি শেষ পর্যন্ত ধৈর্য সহকারে পড়ি।

  • মেরুদণ্ডের গঠন
  • মেরুদণ্ড ব্যথা হয় কী কারণে
  • মেরুদণ্ড ব্যথার উপসর্গ
  • কখন ডাক্তার দেখাবেন
  • মেরুদণ্ড ব্যথা নির্ণয়
  • মেরুদণ্ড ব্যথার চিকিৎসা
  • মেরুদণ্ড ব্যথা হলে ফিজিওথেরাপি
  • মেরুদণ্ড ব্যথা নিয়ে জরুরি পরামর্শ

মেরুদণ্ডের গঠন

ঘাড়, পিঠ, কোমর হয়ে মেরুদণ্ড নেমেছে পশ্চাৎ দেশে। অর্থাৎ ঘাড়, পিঠ ও কোমর জুড়ে এর অবস্থান। মেরুদণ্ড নাম হলেও এটি কোনো দণ্ডাকৃতির হাড় নয়। মাথার খুলি থেকে ঘাড় পর্যন্ত প্রথম ৭টি, এরপর পিঠের অংশে ১২টি এবং কোমরের দিকে মোট ৫টি সহ মোট ২৪টি হাড় বা কশেরুকা এবং মধ্যবর্তী ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্ক নিয়ে মেরুদণ্ড গঠিত। এর সাথে যুক্ত রয়েছে মাংসপেশি, লিগামেন্ট আর গুরুত্বপূর্ণ সব স্নায়ু। মাথার ঠিক নিচ থেকে শুরু হয়ে পশ্চাৎ দেশ পর্যন্ত মেরুদণ্ডের বিস্তৃতি।

মেরুদণ্ড ব্যথা হয় কেন

মেরুদণ্ড যেসব হাড়, ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্ক, মাংসপেশি, লিগামেন্ট, স্নায়ুর সমন্বয়ে গঠিত এ সবকিছুর কোনো না কোনো সমস্যার জন্য মেরুদণ্ডে ব্যথা হতে পারে। যেসব কারণে এগুলোতে সমস্যা তৈরি হয় সেগুলো হচ্ছে-
• দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা
• অনেক ভারী জিনিস ওঠানামা করা
• খেলাধুলার সময় আঘাত
• ঘুমানোর বাজে ভঙ্গিমা
• বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ রোগ
• ডিস্ক প্রোল্যাপ্স, হার্নিয়েটেড ডিস্ক বা স্পাইনাল স্টেনোসিস
• নার্ভাল বা সার্ভিক্যাল স্পন্ডিলাইটিস
• ক্ষয়জনিত রোগ অস্টিওপোরোসিস
• অ্যাঙ্কাইলসিং স্পন্ডিলাইটিস
• স্নায়ুতে চাপ লাগা ইত্যাদি।

মেরুদণ্ড ব্যথার উপসর্গ

• দাঁড়ানো বা বসা অবস্থায় ঘাড়ে ব্যথা অনুভূত হওয়া
• ঘাড় থেকে উৎপন্ন ব্যথা হাতে এবং কোমর থেকে উৎপন্ন ব্যথা পায়ে ছড়িয়ে পড়া
• প্রাথমিক পর্যায়ে কাঁধ ও হাতে ব্যথা
• হাত বা পায়ের বিভিন্ন অংশে ঝিনঝিন, শিন শিন করা
• হাত বা পায়ের বোধশক্তি কমে আসা
• পর্যায়ক্রমে হাত বা পায়ের অসারতা
• ধীরে ধীরে হাত বা পা দুর্বল হয়ে কার্যক্ষমতা লোপ পাওয়া
• চূড়ান্ত পর্যায়ে পঙ্গুত্ব বরণ করা।

কখন ডাক্তার দেখাবেন

• মেরুদণ্ডে ব্যথার সাথে হাত-পায়ের কোনো অংশ অবশ হলে
• মল-মূত্রের বেগ টের না পেলে
• অতীতে ক্যানসার বা যক্ষ্মা রোগের ইতিহাস
• ব্যথার সঙ্গে জ্বর হলে
• তীব্র ব্যথা যা কোনোভাবেই তা কমানো না গেলে
• বাতজনিত ব্যথার সঙ্গে জয়েন্ট ফুলে গেলে
• ব্যথা ছয় সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে।

মেরুদণ্ড ব্যথা নির্ণয়

ব্যথার কারণ অনুসন্ধানের জন্য চিকিৎসকগণ রোগীর বয়স, পেশা, ভারী জিনিস ওঠানোর ইতিহাস, অতীত ও বর্তমানের কোনো রোগ ইত্যাদি ইতিহাসের দিকে বিশেষ নজর দিয়ে থাকেন। এক্স–রে, এমআরআই, রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা যেমন–সিবিসি সিআরপি, বায়োপসি ইত্যাদি পরীক্ষা–নিরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকরা রোগ নির্ণয় করে থাকেন।

মেরুদণ্ড ব্যথার চিকিৎসা

মেরুদণ্ডের ব্যথার কারণ নির্ণয়ের উপর নির্ভর করে চিকিৎসা কী হবে। যদি প্যাথলজিক্যাল কারণে মেরুদণ্ড ব্যথা হয়ে থাকে তাহলে চিকিৎসকরা ওষুধের মাধ্যমে এর চিকিৎসা করে থাকেন। প্রথম পর্যায়ে চিকিৎসকগণ ব্যথানাশক ওষুধ প্রয়োগ করেন। পরে ব্যথার উৎপত্তি যে রোগের জন্য হয়, তার চিকিৎসা করেন। অনেক সময় অপারেশনও প্রয়োজন পড়তে পারে। তবে শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডের ব্যথা মেকানিক্যাল কারণে হয়ে থাকে। তাই মেকানিক্যাল কারণ ধরা পড়লে তা ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। মেকানিক্যাল সমস্যায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা খুবই কার্যকর একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। তাই মেরুদণ্ডের ব্যথা হলে প্রথমেই একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। মেকানিক্যাল কারণে ব্যথা হলে তিনি চিকিৎসা করবেন। আর মেকানিক্যাল কারণে না হলে তিনি যথোপযুক্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিকট পাঠাবেন।

মেরুদণ্ড ব্যথা হলে ফিজিওথেরাপি

রোগের কারণ নির্ণয়ের পর ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক কোন পদ্ধতিতে চিকিৎসা করলে আপনি দ্রুত সুস্থ হবেন তা পরিকল্পনা করেন। চিকিৎসা পদ্ধতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিগুলোই বেছে নেন। এর মধ্যে উল্লেখ যোগ পদ্ধতিগুলো হচ্ছে ম্যাক্যাঞ্জি কনসেপ্ট, মেইটল্যান্ট কনসেপ্ট, সিরিয়াক্স কনসেপ্ট, ম্যালীগান টেকনিক, মাল্টিমডেল ম্যানিপুলেটিভ থেরাপি টেকনিক ইত্যাদি। এসব ম্যানিপুলেটিভ পদ্ধতির সাথে ইলেক্ট্রোথেরাপি প্রয়োগে বেশ ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। ইলেক্ট্রোথেরাপিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউএসটি, এসডব্লিউডি, এমডব্লিউডি, ট্রাকশন, লেজার, আইএফটি, টিইএনএস, আইআরআর ইত্যাদি।

মেরুদণ্ড ব্যথা নিয়ে জরুরি পরামর্শ

• মেরুদণ্ড সোজা করে সঠিক ভঙ্গিতে দাঁড়াতে ও বসতে হবে।
• একটানা বেশিক্ষণ বসে বা না দাঁড়িয়ে আধা ঘণ্টা পরপর পাঁচ মিনিটের জন্য হাঁটাহাঁটি করতে হবে।
• ঘুমের ভেতর বেশি নড়াচড়া করা যাবে না।
• কোনো ভারী জিনিস ওঠাতে গেলে সেটাও মেরুদণ্ড সোজা রেখে ওঠাতে হবে।
• যে ভর আমরা বহন করতে পারি, তার চেয়ে বেশি মাত্রার কিছুই বহন করা যাবে না।
• মেরুদণ্ডের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে নজর দিতে হবে ঘুমানোর ম্যাট্রেসের ওপর। এটি খুব নরম বা শক্ত কোনোটাই হওয়া যাবে না।

প্রিয় পাঠক, আশা করি এই লেখার মাধ্যমে মেরুদণ্ড ব্যথা সম্পর্কে আপনার ধারণা পরিষ্কার করতে পেরেছি। মেরুদণ্ড ব্যথাসহ যেকোনো ব্যথা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে কল করুন আমার হেল্প লাইনে অথবা মেসেজ ইনবক্সে। । ধন্যবাদ শেষ পর্যন্ত লেখাটি পড়ার জন্য। আপনার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

article-footer

Leave a Reply