ভারি কিছু তুলতে বা টানতে গিয়ে হঠাৎ মেরুদণ্ডে কট করে শব্দ। তারপর থেকে মেরুদণ্ডে অবর্ণনীয় ব্যথা। সামনে পিছনে কোনোভাবে বাঁকা হতে পারছেন না। আপনি সম্ভবত ডিস্ক প্রোল্যাপসের শিকার হলেন। মেরুদণ্ডের ব্যথার যতগুলো মেকানিক্যাল কারণ রয়েছে তার মধ্যে ডিস্ক প্রোল্যাপস ৩য় সর্বোচ্চ কারণ।
ডিস্ক প্রোল্যাপসের সঠিক চিকিৎসা না হলে রোগীর স্নায়ু স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এজন্য প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা। আমি ডা. মো: গোলজার আহমেদ, এই লেখায় ডিস্ক প্রোল্যাপেসে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি। আসুন লেখাটি শেষ পর্যন্ত ধৈর্য সহকারে পড়ি।
- ডিস্ক প্রোল্যাপস কী
- ডিস্ক প্রোল্যাপস যেসব কারণে হয়
- কাদের বেশি হয়
- ডিস্ক প্রোল্যাপসের উপসর্গ
- রোগ নির্ণয়
- ডিস্ক প্রোল্যাপসের চিকিৎসা
- জরুরি পরামর্শ
ডিস্ক প্রোল্যাপস কী
আমাদের মেরুদণ্ডে রয়েছে ৩৩ টুকরো হাড় বা কশেরুকা। প্রত্যেকটি হাড়ের উপরে নিচে একটি করে নরম কুশন বা ডিস্ক থাকে। এই ডিস্কগুলোর ভিতরে থাকে জেলির মত উপাদান, যার নাম ‘নিউক্লিয়াস পালপোসা’। আর এই জেলিকে আবৃত্ত করে রাখে ‘অ্যানুলাস ফাইব্রোসাস’ নামক একটি নরম আবরণ। অ্যানুলাস ফাইব্রোসাস আঘাত কিংবা বয়সের কারণে ক্ষয় বা ছিঁড়ে যেতে যেতে পারে। একে আমরা বলি অ্যানুলার টিয়ার। ফলে এর ভিতরের নিউক্লিয়াস পালপোসাও বেরিয়ে যেতে চায়। ডিস্কের এই অবস্থার নামই ডিস্ক প্রোল্যাপস। ডিস্ক প্রোল্যাপসের কারণে স্নায়ুর উপর অপ্রত্যাশিত চাপ তৈরি করে। যা তীব্র ব্যথাসহ নানা জটিল সমস্যা তৈরি করে।
ডিস্ক প্রোল্যাপস যেসব কারণে হয়
সাধারণত দেহের ওজনের চাপ অধিকাংশই মেরুদণ্ডের উপর পড়ে। এই ওজন হঠাৎ যখন অতিরিক্ত হয়ে যায় তখন ডিস্কের পক্ষে তা সামলানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে ডিস্ক প্রোল্যাপস হয়। এছাড়াও মেকানিক্যাল কারণে ডিস্ক প্র নিন্মোক্ত কারণগুলো উল্লেখযোগ্য।
• মেরুদণ্ডে আঘাত
• মেরুদণ্ডের মাংসপেশি ও লিগামেন্ট দুর্বলতা
• ভারি জিনিস তোলা
• জোরে হাঁচি-কাশি
• শরীরচর্চায় দুর্ঘটনা
• দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটারে কাজ
• কঠোর পরিশ্রম
• পুষ্টির অভাব
ডিস্ক প্রোল্যাপস কাদের বেশি হয়
পুরুষের তুলনায় নারীদের ডিস্ক প্রোল্যাপস বেশি হতে দেখা যায়। এছাড়া যাদের স্যাক্রাম নামক কশেরুকা অনেক বড় তারা এর শিকার হন। আবার যাদের এক পা বড়, আরেক পা ছোট তারাও এতে আক্রান্ত হন তুলনামূলক বেশি। যারা উঁচু জুতো পরেন তারাও এতে আক্রান্ত হন।
ডিস্ক প্রোল্যাপসের উপসর্গ
সাধারণত কোমর ও ঘাড়ে ডিস্ক প্রোল্যাপস হয়ে থাকে। তাই দুই জায়গার ব্যথা ২ রকম উপসর্গ দেখা দেয়। কোমরের ডিস্ক প্রোল্যাপসকে Prolapsed Lumbar Intervertebral Disc (PLID) বলা হয়।
কোমরে ডিস্ক প্রোল্যাপসের উপসর্গ:
• কোমরে তীব্র ব্যথা, যা পায়ের দিকেও ছড়িয়ে পড়ে।
• পায়ের মাংসপেশি বা রগে টান লাগা
• পশ্চাৎ দেশ বা নিতম্বের ব্যথা
• পায়ের পাতায় ব্যথা
• পায়ে ঝিনঝিন করা
• প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা
• যৌন অনুভূতি নষ্ট হওয়া ইত্যাদি।
ঘাড়ে ডিস্ক প্রোল্যাপসের উপসর্গ:
• ঘাড়ে ব্যথা ও নাড়াতে কষ্ট হওয়া
• ঘাড় বেঁকে যাওয়া
• হাতে ব্যথা হওয়া
• হাত শিন শিন করা
• জ্বালাপোড়া করা
• হাতের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া
• হাতের মাংসপেশি শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
রোগ নির্ণয়
ডিস্ক প্রোল্যাপসের রোগীকে চিকিৎসকরা কিছু ধারাবাহিক শারীরিক পরীক্ষা করে থাকেন। এর মাধ্যমে তারা মাধ্যমে মেরুদণ্ডের কোন লেভেলে ডিস্ক প্রোল্যাপস হয়েছে তা বোঝার চেষ্টা করেন। কী কারণে ডিস্ক প্রোল্যাপস হয়েছে এবং কোন লেভেলে হয়েছে তা সুনিশ্চিত হওয়ার জন্য অনেক সময় আক্রান্ত স্পাইনের এক্স-রে ও এমআরআই পরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে।
ডিস্ক প্রোল্যাপসের চিকিৎসা
ডিস্ক প্রোল্যাপসের চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য থাকে রোগীকে ব্যথা এবং অন্যান্য উদ্ভূত শারীরিক সমস্যা থেকে স্বস্তি দেওয়া। তাই কারণ নির্ণয়ের পরই ডিস্ক প্রোল্যাপসের চিকিৎসা কী হবে তা নির্ধারণ করেন চিকিৎসকরা। সাধারণত মেকানিক্যাল ও প্যাথলজিক্যাল, এই দুটি কারণ থাকে ডিস্ক প্রোল্যাপসের পেছনে। প্যাথলজিক্যাল কারণের মধ্যে টিউমার উল্লেখযোগ্য। ডায়াগনোসিসে যদি টিউমার ধরা পড়ে তাহলে তা অপারেশন করে ফেলে দিতে হবে। আর মেকানিক্যাল কারণ হলে তার জন্য প্রয়োজন ওষুধ, বিশ্রাম ও ফিজিওথেরাপি। ডিস্ক প্রোল্যাপসের রোগীকে কোনো হাঁটা-চলা বা মুভমেন্ট করা যাবে না। রোগীর অবস্থার উপর ভিত্তি করে হাসপাতালে বা বাসায় ২-৪ সপ্তাহ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিতে হবে। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক নির্দেশিত চিকিৎসামূলক ব্যায়াম বা থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ রোগীকে দ্রুত সুস্থ করে তোলে।
জরুরি পরামর্শ
• দীর্ঘক্ষণ ঝুঁকে কাজ করবেন না।
• সামনে ঝুঁকে ভারি কাজ করবেন না।
• ভারি কাজের সময় কোমরে বেল্ট পরে নিন।
• অতিরিক্ত ওজনের কিছু তোলা যাবে না।
• উঁচু জায়গা থেকে লাফ দেওয়া যাবে না।
• সবসময় মেরুদণ্ড সোজা করে বসুন।
• ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন, ব্যায়াম করুন।
• হাই হিলের জুতো পরিহার করতে হবে।
• ফোমের বদলে শক্ত বিছানায় শোয়ার অভ্যাস করতে হবে।
• বিছানা থেকে ওঠার সময় এক কাতে ভর দিয়ে উঠুন।
• এক হাতে ভারি জিনিস বহন করবেন না।
প্রিয় পাঠক, প্রথমবার ব্যথা থেকেই আপনাকে সতর্ক হতে হবে। কারণ ডিস্ক প্রোল্যাপসের চিকিৎসা না করালে আপনি মারাত্মক পরিণতি ভোগ করবেন। তাই ব্যথাকে অবহেলা না করে দ্রুত একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যে কোনো ব্যথা নিয়ে যদি কোনো প্রশ্ন থাকে তাহলে কল করুন আমার হেল্প লাইনে অথবা মেসেজ ইনবক্সে। ধন্যবাদ শেষ পর্যন্ত লেখাটি পড়ার জন্য। আপনার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
