সেরিব্রাল পালসি হলো একধরণের স্নায়ুবিক ভারসাম্যহীনতা যা চলাফেরা, পেশি শক্তি এবং ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এই সমস্যার সূত্রপাত জন্মের আগেই গর্ভস্থ শিশুর মস্তিষ্ক গঠনের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে। সেরিব্রাল মানে মস্তিষ্কের আর পালসি মানে অবশ হওয়া। সহজ করে বললে সেরিব্রাল পালসি (সিপি) হলো মস্তিষ্ক অবশ হয়ে পড়া। অনেকে একে মস্তিষ্কের প্যারালাইসিসও বলে থাকেন। এটি কোনো রোগ নয়, জন্মগত ত্রুটি।
আমাদের দেশে প্রতি ১০০০ বাচ্চার ৩.৫টি বাচ্চা এর শিকার হয়। এই হার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রায় দেড়গুণ বেশি। আমি ডা. মো: গোলজার আহমেদ, এই লেখায় সেরিব্রাল পালসি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে যাচ্ছি। আসুন লেখাটি শেষ পর্যন্ত ধৈর্য সহকারে পড়ি।
- সেরিব্রাল পালসির কারণ
- সেরিব্রাল পালসির উপসর্গ
- সেরিব্রাল পালসির জটিলতা
- সেরিব্রাল পালসির প্রকরণ
- সেরিব্রাল পালসি নির্ণয়
- সেরিব্রাল পালসি কি ভালো হয়
- সেরিব্রাল পালসির চিকিৎসা
- সেরিব্রাল পালসিতে ফিজিওথেরাপি
সেরিব্রাল পালসির কারণ
ঠিক কী কারণে রোগটি হয় তা নির্দিষ্ট করে বালা যায় না। তবে চিকিৎসকরা গর্ভস্থ শিশুর অপুষ্টি, কোনো ভাবে মস্তিষ্কে আঘাত বা ক্ষত কিংবা বাচ্চা হওয়ার সময় পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পাওয়াকে বিশেষভাবে দায়ী করেন। এছাড়াও নিন্মোক্ত কারণগুলোও তাদের বিবেচনায় থাকে।
• গর্ভবতী মায়ের প্রচুর ঘুমের ওষুধ সেবন করা।
• গর্ভবতী মা যদি প্রয়োজনীয় ফলিক এসিড গ্রহণ না করেন।
• গর্ভাবস্থায় মায়ের বিভিন্ন অসুস্থতা যেমন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত থাইরয়েড, ভাইরাল জ্বর, হাম, রুবেলা, চিকেন পক্স ইত্যাদি হওয়া।
• অপরিণত অবস্থায় ২৮ সপ্তাহের আগে শিশুর জন্ম।
• জন্মের সময় ওজন কম থাকা।
• ডেলিভারির সময় শিশুর মস্তিষ্কে আঘাত লাগা।
• অপরিণত ফুসফুস বা জন্মের পর নিঃশ্বাস নিতে না পারা।
• শিশু মারাত্মকভাবে জন্ডিসে আক্রান্ত হলে।
• শিশুর ডায়াবেটিস হলে।
• শিশুর মাথায় টিউমার হলে।
• শিশু পলিওতে আক্রান্ত হলে।
• শিশুর মস্তিষ্ক ঝিল্লিতে প্রদাহ বা মেনিনজাইটিস হওয়া।
• জ্বর বা ডায়রিয়ার কারণে শিশুর শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়া।
• রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় বিয়ে করা।
• বাবা মায়ের রক্তের গ্রুপ এক হওয়া।
সেরিব্রাল পালসির উপসর্গ
সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুদের একটি সাধারণ উপসর্গ হলো মাথার খুলি ছোট হওয়া। মাথার খুলি ছোট হওয়ার কারণে মস্তিষ্কের পর্দাও ছোট হয়। এছাড়া আরও কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে সব বাচ্চার ক্ষেত্রে রোগের উপসর্গ এবং ধরণ এক রকম হয় না। একেক বাচ্চার একেক রকম হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে-
• শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া।
• হাঁটা-চলা করতে না পারা।
• তাদের ঘাড় শক্ত না হওয়া।
• অন্যদের সাথে যোগাযোগ বা সংযোগ তৈরি করতে না পারা।
• মুখ দিয়ে লালা ঝরা।
• শক্ত খাবার খেতে না পারা।
• অবস্থার অবনতি হলে তরল খাবারও খেতে না পারা।
• অনেক বাচ্চা কথা বলতে পারে না।
• কোনো কোনো বাচ্চা চোখে দেখে না।
• অনেক বাচ্চার হাত-পা শক্ত হয়ে যায় এবং তারা নিজে চলাফেরা করতে পারে না।
• ৬ মাস বয়স হয়ে গেলেও বসতে না পারা।
• এক দেড় বছর বয়স হওয়ার পরও না হাঁটা।
• হামাগুড়ি দিলে একপাশে হেলে পড়া।
• কারও কারও হাঁটার সময় এক পা আরেক পায়ের সাথে জড়িয়ে যায়। একে সিজার গেইট বলে।
সেরিব্রাল পালসির জটিলতা
১. আক্রান্ত শিশুর মাংসপেশির গঠন অস্বাভাবিক হয়: কখনও খুব শক্ত কখনও একদম থলথলে নরম। ফলে শিশুর হাত-পা কুঁকড়ে যাওয়া, পেশি সঙ্কোচন, শরীর হাত পা কাঁপা ইত্যাদি জটিলতা দেখা দেয়।
২. সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুরা শরীরের ভারসাম্য রাখতে পারে না।
৩. সূক্ষ্ম কাজ যেমন লেখা, আঁকা, দাঁত ব্রাশ করা, জুতো পরা ইত্যাদি করতে পারে না।
৪. কথা বলা, নিঃশ্বাস নেওয়া, খাবার খাওয়ার কাজগুলো করতে পারে না।
সেরিব্রাল পালসির প্রকারণ
সাধারণত ৫ ধরণের সেরিব্রাল পালসি রোগী দেখা যায়।
স্পাস্টিক সেরিব্রাল পালসি: প্রায় ৭৭ শতাংশ সিপি আক্রান্ত শিশুর এতে আক্রান্ত হয়ে থাকে। একে হাইপারটনিক সেরিব্রাল পালসিও বলা হয়। এতে আক্রান্ত শিশুর মাংসপেশি অনেক বেশি শক্ত হয়। ফলে শিশুর মুভমেন্টগুলো অতিরিক্ত ঝাঁকি দেওয়ার মত হয়।
অ্যাথেটয়েড সেরিব্রাল পালসি: প্রায় ২.৬% সিপি আক্রান্ত শিশুর অ্যাথেটয়েড সেরিব্রাল পালসি ধরা পড়ে। একে নন-স্পাস্টিক বা ডিসকাইনেটিক সেরিব্রাল পালসিও বলা হয়। এতে আক্রান্ত শিশুর মুখমণ্ডল, কাঁধ এবং হাত-পায়ে অনিচ্ছাকৃত মুভমেন্ট হয়।
অ্যাটাক্সিক সেরিব্রাল পালসি: সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ২.৪% শিশুর অ্যাটাক্সিক সেরিব্রাল পালসি ধরা পড়ে। এই ধরণের সেরিব্রাল পালসিতে শিশু ভারসাম্য, সমন্বিত ও স্বাভাবিক মুভমেন্ট করতে পারে না।
হাইপোটনিক সেরিব্রাল পালসি: ২.৬% শিশুর এই সমস্যা ধরা পড়ে। একে অ্যাটনিক সেরিব্রাল পালসিও বলা হয়। এতে শিশুর মাংসপেশি খুব শিথিল হয়ে থাকে। ফলে শিশু কোনো কিছু করার মত পর্যাপ্ত শক্তি পায় না।
মিক্সড সেরিব্রাল পালসি: কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ক্ষত একটি নির্দিষ্ট স্থানে থাকে না। ফলে অনেক শিশুর একাধিক ধরণের সেরিব্রাল পালসি হওয়ার সম্ভবানা থাকে।
সেরিব্রাল পালসি নির্ণয়
সেরিব্রাল পালসি সাধারণত জন্মের প্রথম বা দ্বিতীয় বছর নির্ণয় করা যায়। সিপি নির্ণয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ অবশ্যই মস্তিষ্কের অবস্থা বোঝার জন্য এক্স-রে, সিটি স্ক্যান অথবা এমআরআই করতে দেবেন। এছাড়াও ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাম (ইইজি) এবং জেনেটিক টেস্টিং, বা মেটাবলিক টেস্টিং অথবা উভয় টেস্টই করিয়ে থাকেন।
সেরিব্রাল পালসি কি ভালো হয়?
সেরিব্রাল পালসির কোনো নিরাময় নেই। অর্থাৎ কখনও ভালো হয় না। যদিও, শিশুর শরীর স্বাভাবিক ও সুস্থ রাখা এবং দৈনন্দিন কাজকর্মের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অনেক চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে ফিজিওথেরাপি অন্যতম। একেক শিশুর একেক সমস্যা হয়ে থাকে। তাই তার সমস্যা ও চাহিদার উপর ভিত্তি করে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার ধরণ বেছে নেওয়া হয়। আবার সমস্যা ও চাহিদাগুলো সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। ফলে যতদ্রুত চিকিৎসা শুরু করা হয় ততো ভালো ফল পাওয়া যায়।
সেরিব্রাল পালসিতে ফিজিওথেরাপি
এতে আক্রান্ত শিশুকে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো তার পেশিশক্তি বৃদ্ধি করা, অস্বাভাবিক মুভমেন্ট স্বাভাবিক করা এবং তার দৈনন্দিন কাজে নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে দেওয়া। এর জন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক শিশুকে চিকিৎসামূলক ব্যায়াম করানোর পাশাপাশি কিছু সাহায্যকারী যন্ত্র (assistive device) যেমন ব্রেস, ক্যাসথ, স্প্লিন্ট ও জুতো দিয়ে থাকেন। এছাড়াও তারা শিশুকে বিভিন্ন ইলেকট্রিক্যাল স্টিমুলেশনও দিয়ে থাকেন। তারা কিছু চিকিৎসামূলক ব্যায়াম বাড়িতে করার জন্যও প্রেস্ক্রাইব করেন। এসব ব্যায়াম বাড়িতে, স্কুলে যেকোনো জায়গায় করা সম্ভব।
প্রিয় পাঠক, আশা করি এই লেখার মাধ্যমে সেরিব্রাল পালসি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দিতে পেরেছি। সেরিব্রাল পালসি নিয়ে যদি কোনো প্রশ্ন থাকে তাহলে কল করুন আমার হেল্প লাইনে অথবা মেসেজ ইনবক্সে। ধন্যবাদ শেষ পর্যন্ত লেখাটি পড়ার জন্য। আপনার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
